আজ খুব গরম একটি দিন। আমি আমার ঢাকার বাসায় কাজ করছি। আমার টেবিলের ওপর এক গ্লাস ঠান্ডা পানি রাখা আছে। আমি ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছি। আমার মাথায় অনেক পুরনো কথা ঘুরছে।
আমি যখন আমার সিএসই পড়াশোনা শেষ করি, তখন অনেক চাপ ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি আমাকে অনেক কাজ করতে হতো। আমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। আমার মনে হতো আমি কিছুই ঠিকমতো করতে পারছি না।
আমার ফোকাস একদম নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমি বুঝতে পারলাম আমার জীবনে রুটিন বা নিয়ম নেই। আমাকে এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তাই আমি নিজেই কিছু নিয়ম মেনে চলার সিদ্ধান্ত নিলাম।
কেন আমার জীবনে নিয়মের খুব বেশি দরকার ছিল
আমি খুব সাধারণ একজন ছাত্র ছিলাম। আমার অনেক বড় কোনো স্বপ্ন ছিল না। কিন্তু আমি আমার কাজগুলো খুব ভালো করে করতে চাইতাম। আমি দেখলাম রুটিন ছাড়া কোনো কাজই ভালো হয় না।
আমি নিজে কিছু ছোট ব্যবসা চালাই। আমি অনলাইনে বই বিক্রি করি এবং কেক বানাই। আবার আমি ফেসবুক অ্যাডস নিয়ে ক্লায়েন্টের কাজও করি। এই সব কিছু একসাথে করা খুব কঠিন একটি কাজ।
আমি যখন প্রথম অনলাইনে কাজ শুরু করি, তখন খুব কষ্ট হতো। ই-কমার্স ব্যবসার অনেক ছোট ছোট কাজ থাকে যা একা করা কঠিন। কাস্টমারদের সাথে কথা বলা, প্রোডাক্ট সাজানো এবং ডেলিভারি দেওয়া। এই সব কিছু করতে গিয়ে আমি আমার নিজের রুটিন হারিয়ে ফেলি।
আমার মনে হতো দিন খুব ছোট আর কাজ অনেক বেশি। আমি রাতে ঘুমাতে পারতাম না চিন্তায়। তখন আমি বুঝতে পারি যে শুধু কাজ করলেই হবে না। কাজের একটি সঠিক নিয়ম বা সিস্টেম থাকা খুব বেশি দরকার। ছাত্রদের জীবনেও ঠিক এমন অনেক চাপ একসাথে আসে।
মাঝে মাঝে আমি কাস্টমারের অর্ডার ভুলে যেতাম। আমার খুব মন খারাপ হতো তখন। আমি বুঝলাম ছাত্রদের জীবনেও ঠিক এমনটিই ঘটে। তারা পড়ার অনেক চাপ একসাথে নিতে পারে না।
তাই আমি ঠিক করলাম আমি নিজেকে বদলাব। আমি নিজে নিজে কিছু পদ্ধতি বের করলাম। এই পদ্ধতিগুলো আমাকে অনেক বেশি সাহায্য করেছে। আজ আমি সেই কাজের কথাগুলো আপনাদের জানাব।
ছাত্রদের জন্য Discipline তৈরি করার ৭টি কার্যকর উপায়
১. প্রতিদিন খুব ছোট একটি কাজ দিয়ে দিন শুরু করুন
আমরা সবাই একসাথে অনেক কিছু বদলাতে চাই। আমরা ভাবি কাল থেকে ১০ ঘণ্টা পড়ব। কিন্তু বাস্তবে এটি করা একদম সম্ভব হয় না। আমাদের শরীর ও মন এত চাপ নিতে পারে না।
আমি নিজে বই পড়তে খুব বেশি ভালোবাসি। আমার নিজের “বই রথ” নামের একটি ছোট বইয়ের পেজ আছে। আমি বই পড়ার ছোট অভ্যাস দিয়ে আমার কাজ শুরু করি। আমি ঠিক করি প্রতিদিন শুধু দুই পৃষ্ঠা বই পড়ব।
এই কাজটি করতে আমার মাত্র পাঁচ মিনিট সময় লাগত। আমি প্রতিদিন এই কাজটি খুব আনন্দ নিয়ে করতাম। ধীরে ধীরে আমি আমার কাজের সময় বাড়াতে থাকি। এটি ছাত্রদের জন্য Discipline তৈরি করার খুব ভালো উপায়।
ছোট কাজ করার আরেকটি ভালো দিক হলো এটি খুব সহজ। আমাদের মন সব সময় কঠিন কাজ থেকে দূরে পালাতে চায়। তাই মনকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য ছোট কাজের ফাঁদ পাততে হয়। আপনি যখন দশ মিনিট পড়ার কথা ভাববেন, মন বাধা দেবে না।
কিন্তু পড়তে বসে আপনি দেখবেন দশ মিনিট কখন এক ঘণ্টা হয়ে গেছে। এটি মানুষের মনের একটি খুব সাধারণ ও মজার খেলা। ছোট কাজ দিয়ে শুরু করলে ভয় অনেক কম লাগে। মনের ওপর কোনো বাজে চাপ পড়ে না।
২. নিজের কাজের জন্য একটি সহজ টাইম ব্লক তৈরি করুন
সময়ের সঠিক ব্যবহার করা খুব জরুরি একটি কাজ। আমি দেখেছি রুটিন না থাকলে সময় নষ্ট হয়। আমি সকালে উঠে ঠিক করতাম আমি কী কী কাজ করব। কিন্তু কোনো কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করা ছিল না।
ফলে আমি একটি কাজ নিয়ে অনেক সময় বসে থাকতাম। আমি ফেসবুক অ্যাডস সেটআপের কাজ করি। পিক্সেল, কনভার্সন এপিআই বা ট্র্যাকিং বসাতে অনেক মনোযোগ দিতে হয়। আমি দেখলাম টানা কাজ করলে আমার মাথা ব্যথা করে।
তাই আমি কাজের সময় ভাগ করে নেওয়া শুরু করলাম। আমি একটানা শুধু ৪০ মিনিট কাজ করি। এরপর আমি দশ মিনিটের একটি ছোট বিরতি নিই। এই নিয়মে কাজ করলে খুব দ্রুত কাজ শেষ করা যায়।
নিচে আমি আমার কাজের একটি সাধারণ ছক তুলে ধরলাম। এই ছকটি আমাকে আমার কাজে খুব ফোকাস রাখে।
| কাজের সময় | কাজের ধরন | ফোকাস লেভেল |
| সকাল ৯টা – ১০টা | নতুন স্কিল শেখা | খুব বেশি |
| দুপুর ১২টা – ১টা | ক্লায়েন্টের অ্যাডস সেটআপ | বেশি |
| বিকেল ৪টা – ৫টা | কেক পেজের মেসেজ চেক | মাঝারি |
| রাত ৮টা – ৯টা | বই পড়া বা নোট লেখা | মাঝারি |
৩. পড়ার সময় মোবাইল ফোন একদম দূরে সরিয়ে রাখুন
মোবাইল ফোন আমাদের সবচেয়ে বড় একটি সমস্যার নাম। আমরা পড়তে বসি, আর বারবার ফোন চেক করি। একটি মেসেজ আসলে আমাদের মনোযোগ একদম নষ্ট হয়ে যায়। এরপর আবার পড়ায় মন বসানো খুব কঠিন হয়।
আমি এখন একটি পেশাদার ইংরেজি কোর্স করছি। আমার কথা বলার জড়তা দূর করার জন্য এটি খুব দরকার। আমি যখন অনলাইনে ক্লাস করি, তখন আমি ফোন দূরে রাখি। আমি ফোন সাইলেন্ট করে অন্য ঘরে রেখে আসি।
এই ছোট কাজটি আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। আমি দেখলাম ফোন ছাড়া আমি অনেক বেশি শান্ত থাকি। আমার মাথায় কোনো বাড়তি চিন্তা বা চাপ থাকে না। আমি খুব মন দিয়ে আমার ক্লাস বুঝতে পারি।
ফোন আমাদের জীবনে অনেক সুবিধা নিয়ে এসেছে এটি সত্যি। কিন্তু এর জন্য আমরা আমাদের ফোকাস খুব দ্রুত হারিয়ে ফেলছি। নোটিফিকেশনের শব্দ শুনলে আমাদের ব্রেন খুব দ্রুত সাড়া দেয়। এটি একটি বাজে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে আমাদের সবার জীবনে।
ছাত্রদের উচিত পড়ার সময় ফোন একদম না ধরা। পড়ার টেবিলে ফোন রাখলে আপনার বারবার দেখতে ইচ্ছা করবে। তাই ফোনটি চোখের আড়াল করে রাখা সবচেয়ে ভালো কাজ। এতে আপনার ফোকাস অনেক বেশি বেড়ে যাবে।
৪. রাতে ঘুমানোর আগে পরের দিনের কাজের লিস্ট করুন
সকালে উঠে কী করব তা ভাবতেই অনেক সময় যায়। এটি খুব বাজে একটি অভ্যাস যা আমাদের কাজের গতি কমিয়ে দেয়। আমি আগে সকালে উঠে কাজের কথা ভাবতাম। এতে আমার অনেক বেশি সময় নষ্ট হয়ে যেত।
আমি আমার কেকের ব্যবসার ডেলিভারি নিয়ে খুব ঝামেলায় পড়তাম। আমার দেবিদ্বার বা কোম্পানিগঞ্জ এলাকায় ডেলিভারি থাকে। মাঝে মাঝে মুরাদনগর বা চান্দিনায় অনেক অর্ডার পাঠাতে হয়। আমি লিস্ট না করলে ভুলে যেতাম কোথায় কী পাঠাতে হবে।
তাই আমি রাতে ঘুমানোর আগে একটি ছোট ডায়েরি নিই। আমি পরের দিন কী কী কাজ করব তা পরিষ্কার করে লিখি। সকালের প্রথম কাজ, দুপুরের কাজ এবং রাতের কাজ ভাগ করে নিই। এতে সকালে উঠে আমার মাথা একদম পরিষ্কার থাকে।
ছাত্রদেরও উচিত পড়ার রুটিন আগের রাতে ঠিক করে রাখা। কাল কোন বিষয় পড়বেন তা আগেই ডায়েরিতে লিখে রাখুন। এটি আপনার মনকে পরের দিনের জন্য প্রস্তুত করে রাখবে।
| কাজের সময় | কাজের নাম | গুরুত্ব |
| সকাল ৯টা | ইংরেজি কোর্সের ক্লাস করা | খুব বেশি |
| দুপুর ২টা | ফেসবুক অ্যাডস এর কাজ করা | বেশি |
| বিকেল ৫টা | বইয়ের অর্ডারগুলো প্যাক করা | মাঝারি |
| রাত ১০টা | পরের দিনের লিস্ট তৈরি করা | খুব বেশি |
৫. ভালো ঘুম এবং নিজের স্বাস্থ্যের অনেক বেশি যত্ন নিন
আমাদের একটি খুব ভুল ধারণা আছে। আমরা ভাবি বেশি রাত জেগে পড়লে অনেক বেশি লাভ হয়। কিন্তু এটি একদম ভুল এবং খুব ক্ষতিকর একটি কাজ। ব্রেন কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম খুব বেশি দরকার।
আমি যখন বিইউবিটি তে পড়তাম তখন অনেক রাত জাগতাম। আমি সিএসই নিয়ে পড়াশোনা করেছি, তাই ল্যাবের অনেক কাজ থাকত। রাত জাগার ফলে পরের দিন আমার খুব খারাপ লাগত। ক্লাসে আমার একদম মন বসত না এবং মেজাজ খুব খিটখিটে থাকত।
আমার সিজিপিএ ৩.৫০ রাখার পেছনে ঘুমের অনেক অবদান ছিল। আমি খুব নিয়ম করে রাত ১১টায় ঘুমাতে যেতাম। আমি প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ভালো করে ঘুমাতাম। এতে সকালে আমার মাথা খুব পরিষ্কার ও ঠান্ডা থাকত।
ভালো ঘুম আপনার ব্রেনকে নতুন পড়া মনে রাখতে সাহায্য করে। তাই ছাত্রদের জন্য Discipline তৈরি করার এটি একটি প্রধান শর্ত। প্রতিদিন কিছু সময় বাইরে হাঁটার অভ্যাস করাও খুব ভালো কাজ। শরীর ভালো থাকলে মন এমনিতেই খুব ফুরফুরে থাকে।
৬. নিজের ছোট কাজ শেষ করে নিজেকে একটি উপহার দিন
আমরা সব সময় শুধু কাজ করতে চাই। কিন্তু আমাদের মন মাঝে মাঝে একটু ছুটি চায়। টানা কাজ করলে কাজের প্রতি খুব বিরক্তি চলে আসে। তাই কাজ শেষে নিজেকে একটু খুশি করা খুব দরকার।
আমি যখন আমার জিএ ফোর (GA4) ট্র্যাকিং এর কাজ শেষ করি, তখন আমি একটু বিশ্রাম নিই। আমি কাজ শেষ করে নিজেকে আমার প্রিয় কোনো খাবার কিনে দিই। মাঝে মাঝে আমি একটু নিজের বানানো কেক খাই। এটি আমাকে খুব শান্তি দেয়।
আপনারাও আপনাদের পড়ার রুটিন শেষ করে নিজেকে উপহার দিন। ধরুন আপনি দুই ঘণ্টা খুব মন দিয়ে অংক করলেন। এরপর আপনি আপনার প্রিয় কোনো গান শুনতে পারেন। অথবা আপনি আপনার প্রিয় কোনো বন্ধুর সাথে গল্প করতে পারেন।
এই ছোট উপহারগুলো আপনার মনকে পরের কাজের জন্য এনার্জি দেবে। আপনি তখন পড়ার মাঝে কোনো বোরিং ভাব পাবেন না। এটি দীর্ঘ সময় ফোকাস ধরে রাখার একটি খুব দারুণ উপায়।
৭. নিজের ভুল থেকে শিখুন এবং আবার নতুন করে শুরু করুন
সব দিন এক রকম যায় না, এটিই জীবনের নিয়ম। রুটিন করার পরও অনেক দিন রুটিন মানা যায় না। মাঝে মাঝে শরীর খারাপ থাকে বা মন ভালো থাকে না। তখন একদম পড়ালেখা করতে ভালো লাগে না।
আমার নিজের জীবনেও এমন অনেক খারাপ দিন এসেছে। আমি কোম্পানির অনেক কাজ ঠিক সময়ে শেষ করতে পারিনি। আমি হতাশ হয়ে ভাবতাম আমাকে দিয়ে হয়তো আর কিছুই হবে না। কিন্তু আমি আমার সেই ভুলগুলো থেকে খুব ভালো শিক্ষা নিয়েছি।
একদিন রুটিন ভাঙলে সব শেষ হয়ে যায় না। পরের দিন সকালে আবার নতুন করে সব কিছু শুরু করা যায়। ছাত্রদের জন্য Discipline তৈরি করার সবচেয়ে বড় উপায় হলো হাল না ছাড়া। আপনি যতবার হোঁচট খাবেন, ততবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবেন।
নিজের ওপর খুব বেশি রাগ করবেন না কখনো। নিজেকে সময় দিন এবং নিজের কাজের ধরন বোঝার চেষ্টা করুন। আপনি মানুষ, কোনো রোবট নন, তাই ভুল হওয়া খুব স্বাভাবিক। শুধু খেয়াল রাখবেন একই ভুল যেন বারবার না হয়।
আমার শেষের কিছু খুব দরকারি কথা
এই নিয়মগুলো আমি আমার নিজের জীবনে মেনে চলেছি। এগুলো কোনো জাদুর কাঠি নয় যে এক দিনেই সব ঠিক হবে। আপনাকে প্রতিদিন একটু একটু করে চেষ্টা করতে হবে। প্রথমে অনেক বেশি কষ্ট হবে, কিন্তু পরে অভ্যাস হয়ে যাবে।
আপনারা যারা পড়ায় মন বসাতে পারেন না, তারা আজই শুরু করুন। খুব ছোট একটি কাজের লিস্ট বানিয়ে ফেলুন। শুধু আগামী সাত দিন এই সহজ নিয়মগুলো মেনে চলার চেষ্টা করুন। আমি নিশ্চিত আপনারা নিজেদের মাঝে অনেক বড় পরিবর্তন দেখতে পাবেন।
পড়ালেখা জীবনের একটি অংশ, এটিই সব কিছু নয়। কিন্তু এই সময় আপনি যে শৃঙ্খলার মাঝে থাকবেন, তা সারা জীবন কাজে লাগবে। আপনাদের সবার জন্য আমার মন থেকে অনেক শুভকামনা রইল। আপনারা আপনাদের রুটিন তৈরি করে কাজ শুরু করে দিন।




