ইকিগাই এর ৫ টি নীতি কি কি? জাপানিদের দীর্ঘ ও সুখী জীবনের গোপন সূত্র

একটা সময় ছিল, আমি সকালে উঠে জানতাম না কেন এত দৌড়াচ্ছি। বাসা থেকে অফিস, অফিস থেকে বাসা। রাতে আবার একই প্রশ্ন—এটাই কি সব? ঠিক সেই সময় একটা বই হাতে পাই—Ikigai

এই লেখায় আমি নিজের পড়া, ভাবা আর ছোট ছোট প্রয়োগের অভিজ্ঞতা থেকে বলব—ইকিগাই এর ৫ টি নীতি কি কি? আর এগুলো বাংলাদেশি জীবনে কীভাবে কাজে লাগে। চা হাতে নিয়ে পড়ার মতো করে লিখছি।

ইকিগাই কী এবং এটি কেন জরুরি?

ইকিগাই মানে হলো “বেঁচে থাকার কারণ”। সোজা কথায়, যেই কাজের জন্য আপনি প্রতিদিন সকালে খুশি মনে ঘুম থেকে ওঠেন।

অনেকে ভাবেন ইকিগাই মানে শুধু ক্যারিয়ার বা টাকা। আসলে তা নয়। এটি হলো ছোট ছোট আনন্দে বেঁচে থাকা। আমাদের দেশে আমরা প্রায়ই “লোকে কী বলবে” ভেবে নিজের স্বপ্ন মাটি চাপা দিই। কেউ ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, কিন্তু পরিবারের চাপে ডাক্তার হয়।

ফলে কাজ আছে, টাকা আছে, কিন্তু মনে শান্তি নেই। ইকিগাই আপনাকে সেই হারিয়ে যাওয়া শান্তি খুঁজে পেতে সাহায্য করে। এটি আপনাকে শেখায়, কীভাবে নিজের পছন্দের কাজ করে জীবনটা উপভোগ করা যায়।

ইকিগাই এর ৫ টি নীতি কি কি? বিস্তারিত আলোচনা

নিউরোসায়েন্টিস্ট কেন মোগি ইকিগাইকে ৫টি বিশেষ স্তম্ভ বা নীতির ওপর দাঁড় করিয়েছেন। এই নীতিগুলো খুব সহজ, কিন্তু বেশ গভীর।

১. ছোট থেকে শুরু করা (Starting Small)

আমরা বাঙালিরা মাঝে মাঝে একটু বেশিই আবেগপ্রবণ। আমরা ভাবি, কিছু করলে ধামাকা করব, নাহলে করব না। কিন্তু ইকিগাই বলে উল্টো কথা।

  • বড় লাফের দরকার নেই।
  • ছোট ছোট পদক্ষেপ নিন।

আমি যখন আমার অনলাইন বুকশপ “বই রথ” শুরু করি, তখন আমার কাছে হাজার হাজার বই ছিল না। অল্প কিছু বই আর একটা ছোট ফেসবুক পেজ ছিল। আমি যদি ভাবতাম, “আগে বড় অফিস নেব, তারপর শুরু করব”—তাহলে হয়তো শুরুই হতো না। আপনি যদি বই পড়ার অভ্যাস করতে চান, দিনে ১ পৃষ্ঠা পড়ুন। এই ছোট শুরুটাই আপনাকে অনেক দূর নিয়ে যাবে।

২. নিজেকে মুক্ত করা (Releasing Yourself)

আমরা সারাক্ষণ নিজেকে নিয়ে খুব সচেতন থাকি। আমার শার্টটা কি ঠিক আছে? আমার প্রোফাইল পিকচারটা কি স্মার্ট হয়েছে? মানুষ কী ভাববে?

  • এই চিন্তাগুলো আমাদের শেকলের মতো আটকে রাখে।
  • ইকিগাই শেখায় শিশুর মতো সরল হতে।

শিশুরা যেমন কোনো কিছু নিয়ে লজ্জা পায় না, মন খুলে হাসে, আমাদেরও তেমন হওয়া উচিত। আমি যখন প্রথম প্রথম ভিডিও বানাতাম, খুব জড়তা কাজ করত। এখন আমি ওসব ভাবি না। আমি শুধু আমার কাজটা উপভোগ করি। নিজের ইগো ঝেড়ে ফেললে জীবনটা অনেক হালকা মনে হয়।

More Post: ইকিগাই গ্রন্থের মূল কথা কি? সুখী জীবনের জাপানি মন্ত্র

৩. সামঞ্জস্য এবং স্থায়িত্ব (Harmony and Sustainability)

মানুষ একা বাঁচতে পারে না। আমাদের আশেপাশে মানুষ আছে, সমাজ আছে, প্রকৃতি আছে। সবার সাথে মিলেমিশে থাকাই হলো হার্মনি।

  • নিজের লাভের জন্য অন্যের ক্ষতি করবেন না।
  • সবাইকে নিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করুন।

ধরুন, আপনি বাসে বা রিকশায় যাচ্ছেন। অকারণে ভাড়া নিয়ে তর্ক না করে, হাসিমুখে কথা বলে দেখুন। দিনটা ভালো যাবে। জাপানিরা বিশ্বাস করে, আপনি যদি সমাজের উপকারে আসেন, সমাজ আপনাকে ফিরিয়ে দেবে। আমিও দেখেছি, কাস্টমারদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখলে ব্যবসা এমনিতেই ভালো হয়।

৪. ছোট ছোট জিনিসে আনন্দ খুঁজে পাওয়া (The Joy of Little Things)

সুখ কোনো বড় লটারির টিকেট নয়। সুখ ছড়িয়ে আছে আমাদের চারপাশেই। আমরা শুধু তাকাতে ভুলে যাই।

  • সকালে এক কাপ গরম চায়ের ধোঁয়া।
  • বিকেলে একটু খোলা আকাশ দেখা।
  • নতুন বইয়ের পাতার গন্ধ।

আমার কাছে সুখ মানে হলো, যখন কোনো পাঠক আমাকে মেসেজ দিয়ে বলে, “ভাইয়া, বইটা পড়ে আমার খুব উপকার হয়েছে।” এই ছোট মেসেজটা আমার সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে দেয়। বড় প্রমোশন বা নতুন গাড়ির জন্য অপেক্ষা করবেন না। ছোট মুহূর্তগুলো উপভোগ করুন।

৫. বর্তমান মুহূর্তে বেঁচে থাকা (Being in the Here and Now)

আমরা হয় অতীতের ভুল নিয়ে আফসোস করি, নাহলে ভবিষ্যতের চিন্তায় অস্থির থাকি। মাঝখান থেকে “বর্তমান” সময়টা হারিয়ে যায়।

  • যখন চা খাচ্ছেন, তখন শুধুই চায়ের স্বাদ নিন।
  • যখন বই পড়ছেন, তখন ফোনটা দূরে রাখুন।

ইকিগাই আমাদের শেখায় ‘মাইন্ডফুলনেস’। আমি আগে কাজ করার সময় বারবার নোটিফিকেশন চেক করতাম। এতে কাজের বারোটা বাজত, মনও শান্ত থাকত না। এখন চেষ্টা করি, যখন যেই কাজ, তখন শুধুই সেই কাজ। এতে মানসিক শান্তি পাওয়া যায়।

More Post: How To Talk To Anyone Book PDF Bangla – Free

দৈনন্দিন জীবনে এই ৫টি নীতি প্রয়োগ করার উপায়

তাত্ত্বিক কথা তো অনেক হলো। এবার চলুন দেখি, আমাদের এই জ্যাম আর ব্যস্ততার শহরে এগুলো কীভাবে কাজে লাগানো যায়।

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নেবেন না। নিজের জন্য ১০টা মিনিট সময় নিন। এক গ্লাস পানি খান, বা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ান। নিজেকে প্রশ্ন করুন, আজ আমি কোন কাজটা মন দিয়ে করব?

  • কাজের ফাঁকে ৫ মিনিট বিরতি নিন।
  • সহকর্মীদের সাথে হাসিমুখে কথা বলুন।
  • রাতে ঘুমানোর আগে ভাবুন, আজকের দিনে ভালো কী ঘটেছে?

আপনার ভালো লাগার কাজগুলো খুঁজে বের করুন। সেটা হতে পারে বাগান করা, রান্না করা বা বই পড়া। ইকিগাই বা অ্যাটমিক হ্যাবিটস-এর মতো বইগুলো আপনাকে এই গাইডলাইন দিতে পারে।

উপসংহার

ইকিগাই কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি পথ চলা। এই পথে ক্লান্তি কম, আর আনন্দ বেশি।

সব প্রশ্নের উত্তর আজই পেতে হবে—এমন কোনো কথা নেই। শুধু নিজের মনের আওয়াজটা শোনার চেষ্টা করুন। আজ থেকেই এই ৫টি নীতির যেকোনো একটি পালন করা শুরু করুন। দেখবেন, জীবনটা অনেক সুন্দর হয়ে গেছে।

আপনার ইকিগাই কী? কমেন্টে জানাতে পারেন, অথবা নিজেকেই প্রশ্ন করুন—আজ আমার ঘুম থেকে ওঠার আসল কারণ কী ছিল?

ইকিগাই সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQs)

ইকিগাই এর ৫ টি নীতি কী কী?

নীতিগুলো হলো—ছোট শুরু, নিজেকে মুক্ত করা, সামঞ্জস্য, ছোট আনন্দ ও বর্তমানে বাঁচা। এই ৫টি স্তম্ভ জীবনকে সহজ ও সুন্দর করে তোলে।

আমার ইকিগাই কীভাবে খুঁজে পাব?

নিজের পছন্দের কাজগুলো ভাবুন। যা করতে ভালো লাগে, তাই করুন। ছোট কাজ দিয়ে শুরু করুন। তাড়াহুড়ো করবেন না। নিজের মনকে প্রশ্ন করুন।

ইকিগাই কি শুধুই ক্যারিয়ার বা টাকা?

না, একদমই না। এটা শুধু টাকার জন্য নয়। শখের বাগান করা বা গান শোনাও ইকিগাই হতে পারে। এটি মূলত মনের শান্তির খোঁজ দেয়।

ছাত্রজীবনে কি ইকিগাই কাজে লাগে?

হ্যাঁ, অবশ্যই কাজে লাগে। এটি পড়ার চাপ কমায়। ছোট টার্গেট নিয়ে পড়া শুরু করুন। এতে মনোযোগ বাড়ে। জীবন গুছিয়ে নিতে সুবিধা হয়।

ইকিগাই নিয়ে কোন বইটি পড়া শুরু করব?

হেক্টর গার্সিয়ার লেখা ‘ইকিগাই’ বইটি সেরা। এতে জাপানিদের সুস্থ জীবনের গোপন কথা আছে। বইটি খুব সহজ ভাষায় লেখা। পড়লে ভালো লাগবে।

Need Any self-help books visit our website -  www.boirath.com

1 thought on “ইকিগাই এর ৫ টি নীতি কি কি? জাপানিদের দীর্ঘ ও সুখী জীবনের গোপন সূত্র”

Leave a Comment