সকাল সাতটায় যখন ফোনের অ্যালার্মটা বেজে ওঠে, তখন আপনার প্রথম অনুভূতিটা কী হয়? বিরক্তি? নাকি বিছানা ছেড়ে ওঠার একটা আলাদা উত্তেজনা কাজ করে?
সত্যি বলতে, বছর দুয়েক আগেও আমার সকাল শুরু হতো বিরক্তি দিয়ে। ঢাকার জ্যাম, অফিসের ডেডলাইন আর হাজারো চিন্তায় মনে হতো—ধুর! জীবনটা কি শুধু দৌড়ানোর জন্য? ঠিক তখনই আমার হাতে আসে একটা ছোট্ট বই। নাম ‘ইকিগাই’। আজ আমি আপনাদের বলব ইকিগাই গ্রন্থের মূল কথা কি এবং কীভাবে এটি আমার চিন্তা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। কোনো কঠিন তত্ত্ব কথা নয়, একদম আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলব।
ইকিগাই আসলে কী?
খুব সহজ কথায়, ইকিগাই হলো আপনার সকালে বিছানা ছেড়ে ওঠার আসল কারণ বা উদ্দেশ্য।
জাপানি ভাষায় ‘ইকি’ মানে জীবন আর ‘গাই’ মানে মূল্য। অর্থাৎ জীবনের মূল্য। আমি যখন বইটি পড়ছিলাম, তখন বুঝলাম আমরা অনেকেই ভুল জিনিসের পেছনে ছুটছি। আমরা ভাবি অনেক টাকা বা বড় পদ পেলেই সুখী হব। কিন্তু ইকিগাই বলে অন্য কথা। এটি চারটি বিষয়ের মিলনস্থল:
- যা আপনি ভালোবাসেন: যেমন আমার বই পড়তে ভালো লাগে।
- যা পৃথিবী বা সমাজের প্রয়োজন: মানুষের সঠিক জ্ঞান দরকার।
- যার জন্য আপনাকে দাম দেওয়া হবে: এটি আপনার পেশা হতে পারে।
- যে কাজে আপনি দক্ষ: যা আপনি সহজেই করতে পারেন।
যখন এই চারটা জিনিস এক হয়, তখনই আপনি আপনার ইকিগাই খুঁজে পান।
ইকিগাই গ্রন্থের মূল কথা কি এবং কেন এটি দরকার?
বইটির মূল দর্শন হলো অবসর বা অলসতা নয়, বরং আমৃত্যু নিজের পছন্দের কাজের মধ্যে ডুবে থাকার নামই জীবন।
আমাদের দেশে একটা ধারণা আছে যে, ৬০ বছর হলেই সব কাজ ছেড়ে দিয়ে শুয়ে-বসে দিন কাটানো উচিত। ইকিগাই গ্রন্থের মূল কথা কি জানেন? বইটিতে বলা হয়েছে—কখনোই অবসর নেবেন না। জাপানের ওকিনাওয়ায় মানুষ ১০০ বছরের বেশি বাঁচে কারণ তারা শেষ দিন পর্যন্ত সক্রিয় থাকে।
বইটি পড়ার পর আমি একটা পরিবর্তন এনেছি। আগে ছুটির দিনে শুয়ে থাকতাম। এখন ছুটির দিনেও আমি ছোটখাটো কাজ করি। হয়তো ছাদের বাগানে পানি দিই, বা নতুন কোনো রেসিপি ট্রাই করি। বিশ্বাস করুন, শরীর আর মন দুটোই আগের চেয়ে ভালো থাকে।
ওকিনাওয়ার মানুষের খাওয়ার গোপন নিয়ম
ওরা পেট ভরে খায় না, বরং পেটের ২০ ভাগ খালি রেখে খাওয়া শেষ করে।
বইটিতে একটি চমৎকার কনসেপ্ট আছে, যার নাম ‘হারা হাচি বু’। এর মানে হলো পেট ৮০% ভরলেই খাওয়া থামিয়ে দিন। আমরা বাঙালিরা তো গলা পর্যন্ত না খেলে তৃপ্তি পাই না! বিশেষ করে কোনো বিয়ে বাড়ির দাওয়াতে গেলে তো কথাই নেই।
আমি ব্যক্তিগতভাবে এই নিয়মটা মানার চেষ্টা করেছি। দুপুরের খাবারে ভাত একটু কমিয়ে দিয়েছি। ফলাফল? আগে দুপুরের পর যে ঝিমুনি আসত, সেটা এখন আর নেই। শরীরটা বেশ হালকা লাগে। কাজের এনার্জিও পাই অনেক বেশি।
- খাবার খুব ধীরে ধীরে চিবিয়ে খান।
- ছোট প্লেটে খাবার নিন, তাহলে কম মনে হবে না।
- পেট একটু খালি রেখেই টেবিল থেকে উঠুন।
ব্যস্ততার মাঝেও ‘ফ্লো’ খুঁজে পাওয়া
কাজের মধ্যে এমনভাবে ডুবে যান যেন সময়ের কোনো খেয়াল না থাকে, এটাই আসল সুখ।
আপনার কি কখনো এমন হয়েছে যে, কোনো কাজ করতে করতে কখন যে দুই ঘণ্টা পার হয়ে গেছে টেরই পাননি? হয়তো ছবি আঁকছিলেন বা প্রিয় কোনো গান শুনছিলেন। লেখকরা একে বলেন ‘ফ্লো’ (Flow)।
ইকিগাই গ্রন্থের মূল কথা কি—এটা বুঝতে হলে আপনাকে এই ‘ফ্লো’ খুঁজে পেতে হবে। আমার জন্য এটা হলো লেখালেখি। যখন আমি লিখতে বসি, তখন জ্যামের শব্দ বা অফিসের টেনশন—সব ভুলে যাই। আপনার ফ্লো কিসে আসে? সেটা খুঁজে বের করুন। হতে পারে সেটা:
- গিটার বাজানো।
- পুরানো কোনো যন্ত্রপাতি মেরামত করা।
- অথবা বিকেলে পার্কে হাঁটা।
একা নয়, সবার সাথে বাঁচুন
মানুষ একা বাঁচতে পারে না, ভালো বন্ধুদের সাথে আড্ডা হলো সেরা ওষুধ।
বইটি পড়ে আমি একটা জিনিস খুব ভালো করে বুঝেছি—সামাজিক বন্ধন খুব জরুরি। ওকিনাওয়ায় ‘মোয়াই’ (Moai) নামে ছোট ছোট গ্রুপ থাকে। তারা একে অপরের বিপদে পাশে দাঁড়ায়, আবার সুখের সময়ও একসাথে থাকে।
আমাদের যান্ত্রিক শহরে এটা খুব দরকার। আমি এখন চেষ্টা করি সপ্তাহে অন্তত একদিন বন্ধুদের সাথে টং দোকানে চা খেতে। ফোনের স্ক্রিন বাদ দিয়ে মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা—এর চেয়ে বড় শান্তি আর কিছুতে নেই।
- পুরানো বন্ধুদের ফোন দিন।
- পরিবারের সাথে সময় কাটান।
- হাসি-ঠাট্টা করুন, মন ভালো থাকবে।
উপসংহার
সুখ কোনো গন্তব্য নয়, এটি প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজের সমষ্টি।
ইকিগাই গ্রন্থের মূল কথা কি—এটা জানার চেয়ে বড় বিষয় হলো এটি জীবনে প্রয়োগ করা। আমাকে যদি এক কথায় বলতে বলেন, তবে বলব—জীবনটাকে জটিল করবেন না। তাড়াহুড়ো কমিয়ে দিন। আপনার যা করতে ভালো লাগে, তাই করুন।
বড় অর্জনের দরকার নেই। আজকের বিকেলের বাতাসটা উপভোগ করা, বা প্রিয় মানুষটার সাথে এক কাপ চা খাওয়া—এটাই তো ইকিগাই। আপনি কি আপনার ইকিগাই খুঁজে পেয়েছেন? আজই একটু ভাবুন না!
ইকিগাই মানে হলো বেঁচে থাকার কারণ। বইটির মূল কথা হলো নিজের পছন্দের কাজ করা। এতে জীবন সুন্দর ও দীর্ঘ হয়। কাজের আনন্দেই আসল সুখ মেলে।
এটি আপনাকে মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে। আপনি ছোট ছোট কাজেও আনন্দ খুঁজে পাবেন। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার নতুন উৎসাহ পাবেন।
এটি জাপানিদের খাওয়ার একটি গোপন নিয়ম। পেট ৮০ ভাগ ভরলেই খাওয়া বন্ধ করতে হয়। এতে শরীর সুস্থ থাকে এবং অলসতা কমে যায়।
না, এই বই অবসরের পক্ষে নয়। শেষ বয়স পর্যন্ত কাজ করে যাওয়াই হলো আসল সুখ। শরীর ও মন সচল থাকলেই আপনি ভালো থাকবেন।
ভাবুন কোন কাজটা আপনি সবচেয়ে ভালোবাসেন। যেই কাজে আপনার সময় জ্ঞান থাকে না, সেটাই আপনার ইকিগাই। আজই তা একটু একটু করে শুরু করুন।
Need Any self-help books visit our website - www.boirath.com





2 thoughts on “ইকিগাই গ্রন্থের মূল কথা কি? সুখী জীবনের জাপানি মন্ত্র”