প্রতিদিন বিটরুট (beetroot) খেলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে, শারীরিক সহনশীলতা বাড়ে এবং হজমতন্ত্র ভালো কাজ করে। এর মূল কারণ হলো বিটরুটে থাকা প্রাকৃতিক নাইট্রেট, যা শরীরে নাইট্রিক অক্সাইড তৈরি করে রক্তনালি প্রসারিত করে। পাশাপাশি এতে থাকা ফাইবার ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সাহায্য করে।
তবে প্রতিদিনের এই অভ্যাস সবার জন্য একই রকম ফল দেয় না। আপনার কিডনির অবস্থা, বর্তমান রক্তচাপ বা খাওয়া ওষুধের ধরনের ওপর ভিত্তি করে বিটরুটের প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। এই লেখায় বিটরুটের পুষ্টিগুণ, শরীরে এর সুনির্দিষ্ট কাজ, সঠিক পরিমাণ এবং কারা এটি এড়িয়ে চলবেন তার বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
বিটরুটে কোন পুষ্টি উপাদানগুলো কাজ করে
বিটরুটকে পুষ্টিবিদরা অনেক সময় 'সুপারফুড' বলেন, কারণ এর ছোট আকারের তুলনায় পুষ্টির ঘনত্ব বেশি। প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা বিটরুটে প্রায় ৪৩ ক্যালোরি থাকে, যা দৈনিক খাদ্যতালিকায় খুব সামান্য চাপ ফেলে।
এতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফোলেট (ভিটামিন বি৯), পটাশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন এবং ভিটামিন সি থাকে। ফোলেট কোষ বিভাজন ও নতুন ডিএনএ তৈরিতে সাহায্য করে, যা বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের জন্য জরুরি। পটাশিয়াম শরীরের তরল ভারসাম্য ও পেশির সংকোচনে কাজ করে।
বিটরুটের গাঢ় লাল বা বেগুনি রঙের পেছনে কাজ করে 'বিটালিন' নামের এক ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই উপাদানটি শরীরে প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন কমাতে সাহায্য করে। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ থেকে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তাই বিটালিনের উপস্থিতি বিটরুটকে অন্য অনেক সবজি থেকে আলাদা করে।
রক্তচাপ ও রক্তনালিতে বিটরুটের প্রভাব
প্রতিদিন বিটরুট খাওয়ার সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণিত প্রভাব দেখা যায় রক্তচাপের ওপর। বিটরুটে প্রচুর পরিমাণে ডায়েটারি নাইট্রেট থাকে। আপনি যখন বিটরুট চিবিয়ে খান বা এর রস পান করেন, মুখের লালাগ্রন্থির ব্যাকটেরিয়া এই নাইট্রেটকে নাইট্রাইটে রূপান্তরিত করে।
পাকস্থলীতে পৌঁছানোর পর এই নাইট্রাইট নাইট্রিক অক্সাইডে পরিণত হয়। নাইট্রিক অক্সাইড একটি গ্যাসীয় অণু, যা রক্তনালির পেশিকে শিথিল করে এবং নালিগুলোকে প্রশস্ত করে দেয়। নালি প্রশস্ত হলে রক্ত সহজে চলাচল করতে পারে এবং রক্তচাপ কমে আসে।
উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন আছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি বেশি কার্যকর। সাধারণত বিটরুট খাওয়ার ২ থেকে ৩ ঘণ্টার মধ্যে রক্তচাপে পরিবর্তন শুরু হয়। তবে আপনার যদি আগে থেকেই রক্তচাপ খুব কম থাকে (হাইপোটেনশন), তাহলে প্রতিদিন অতিরিক্ত বিটরুট খেলে মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা বাড়তে পারে।
শারীরিক কর্মক্ষমতা ও সহনশীলতায় প্রভাব
যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন বা দৌড়ান, তাদের কাছে বিটরুটের জুস বেশ জনপ্রিয়। এর কারণও সেই নাইট্রিক অক্সাইড। রক্তনালি প্রশস্ত হওয়ার ফলে পেশিতে বেশি পরিমাণে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছায়।
ব্যায়ামের সময় পেশিকে কাজ চালিয়ে যেতে অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। বিটরুট খেলে পেশি একই পরিমাণ কাজ করতে তুলনামূলক কম অক্সিজেন খরচ করে। এর ফলে আপনি দ্রুত ক্লান্ত হন না এবং দীর্ঘক্ষণ শারীরিক পরিশ্রম করতে পারেন।
একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক। ধরুন, আপনি প্রতিদিন সকালে ৩০ মিনিট দৌড়ান। দৌড়ানোর ২ থেকে ৩ ঘণ্টা আগে যদি আপনি ২০০ মিলিলিটার বিটরুটের জুস পান করেন, তবে আপনার পেশিতে অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়বে। ফলে আগের চেয়ে একই সময়ে কিছুটা বেশি দূরত্ব অতিক্রম করা বা শেষ দিকে ক্লান্তি কম অনুভব করা সম্ভব হতে পারে।
তবে এই সুবিধা মূলত মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার অ্যারোবিক ব্যায়ামে বেশি দেখা যায়। আপনি যদি শুধু হালকা হাঁটাহাঁটি করেন, তাহলে বিটরুটের এই নির্দিষ্ট সুবিধাটি হয়তো খুব বড় কোনো পার্থক্য তৈরি করবে না।
হজমশক্তি ও অন্ত্রের স্বাস্থ্যে ভূমিকা
বিটরুটে ভালো পরিমাণে ডায়েটারি ফাইবার বা আঁশ থাকে। প্রতি ১০০ গ্রাম বিটরুটে প্রায় ২.৮ থেকে ৩ গ্রাম ফাইবার পাওয়া যায়। এই ফাইবার পাকস্থলীতে হজম হয় না, বরং অন্ত্রে গিয়ে পানি শোষণ করে মলের আকার বড় ও নরম করে।
এর ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমে এবং টয়লেটে যাওয়া সহজ হয়। প্রতিদিন পর্যাপ্ত ফাইবার খেলে অন্ত্রের ভেতরের পরিবেশ ভালো থাকে।
ফাইবার অন্ত্রে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাবার হিসেবেও কাজ করে। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো ফাইবার ভেঙে শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করে, যা অন্ত্রের ভেতরের দেয়ালকে সুস্থ রাখে। অন্ত্র সুস্থ থাকলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও ভালো থাকে।
কাদের প্রতিদিন বিটরুট খাওয়া উচিত নয়
বিটরুট পুষ্টিকর হলেও কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক অবস্থায় এটি প্রতিদিন খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
কিডনিতে পাথর বা পাথরের প্রবণতা: বিটরুটে 'অক্সালেট' নামের একটি যৌগ থাকে। যাদের শরীরে ক্যালসিয়াম অক্সালেট কিডনি স্টোন বা পাথর তৈরির ইতিহাস আছে, তাদের প্রতিদিন বিটরুট খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। অতিরিক্ত অক্সালেট প্রস্রাবের সাথে মিশে পাথর তৈরির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
রক্তচাপের ওষুধ সেবনকারী: আপনি যদি উচ্চ রক্তচাপ কমানোর জন্য নিয়মিত ওষুধ খান, তাহলে প্রতিদিন বিটরুট খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ওষুধ এবং বিটরুটের নাইট্রেট একসাথে কাজ করলে রক্তচাপ হঠাৎ করে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি কমে যেতে পারে।
ডায়াবেটিস রোগী: বিটরুটে প্রাকৃতিক শর্করা বা চিনি অন্যান্য অনেক সবজির তুলনায় কিছুটা বেশি থাকে। প্রতিদিন অতিরিক্ত পরিমাণে বিটরুট বা এর মিষ্টি জুস খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রায় প্রভাব পড়তে পারে। ডায়াবেটিস থাকলে পুরো বিটরুট (জুসের বদলে) অল্প পরিমাণে খাওয়া এবং রক্তের শর্করা পর্যবেক্ষণ করা ভালো।
কাঁচা, রান্না বা জুস: কোনভাবে খাওয়া ভালো
বিটরুট কীভাবে খাচ্ছেন তার ওপর নির্ভর করে আপনি কতটুকু পুষ্টি পাচ্ছেন তা বদলে যায়।
কাঁচা বিটরুট: সালাদে কুচিয়ে বা কুরিয়ে কাঁচা বিটরুট খেলে এর ভিটামিন সি এবং নাইট্রেট সবচেয়ে বেশি পরিমাণে শরীরে পৌঁছায়। তাপে এই উপাদানগুলো কিছুটা নষ্ট হয়ে যায়। তবে কাঁচা বিটরুটের স্বাদ মাটির মতো (earthy) হওয়ায় সবার কাছে এটি সহনীয় নাও হতে পারে।
সিদ্ধ বা রান্না করা বিটরুট: আমাদের দেশে তরকারি বা ভর্তা হিসেবে বিটরুট সিদ্ধ করে খাওয়া হয়। বেশিক্ষণ ধরে পানিতে সিদ্ধ করলে এর পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন এবং নাইট্রেট পানিতে মিশে যায়। তাই খুব বেশি পানিতে দীর্ঘক্ষণ না সিদ্ধ করে, অল্প পানিতে ঢেকে রাখা বা ভাপে (steam) রান্না করা ভালো। রান্না করলে ফাইবার নরম হয় এবং হজম করা সহজ হয়।
বিটরুটের জুস: জুস করলে নাইট্রেট দ্রুত শরীরে শোষিত হয়, যা রক্তচাপ কমাতে বা ব্যায়ামের আগে দ্রুত কাজ পেতে সাহায্য করে। কিন্তু জুস করার সময় ফাইবার বা আঁশ বাদ পড়ে যায়। ফাইবার ছাড়া চিনি দ্রুত রক্তে মেশে। তাই পুরো বিটরুট খাওয়া এবং জুস পান করার মধ্যে পুষ্টিগত পার্থক্য আছে।
| খাওয়ার ধরন | নাইট্রেট প্রাপ্তি | ফাইবার প্রাপ্তি | হজমের সুবিধা |
|---|---|---|---|
| কাঁচা | সবচেয়ে বেশি | পুরোটা থাকে | কিছুটা কঠিন হতে পারে |
| সিদ্ধ/রান্না | কিছুটা কমে যায় | পুরোটা থাকে | সহজ |
| জুস | দ্রুত ও বেশি শোষিত হয় | প্রায় থাকে না | খুব সহজ |
প্রতিদিন কতটুকু বিটরুট খাওয়া নিরাপদ
পরিমাণের বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো পুষ্টিকর খাবারই অতিরিক্ত খেলে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন মাঝারি আকারের ১টি বিটরুট (আনুমানিক ৭০ থেকে ১০০ গ্রাম) খাওয়া নিরাপদ এবং যথেষ্ট। আপনি যদি জুস পান করতে চান, তবে দিনে ২০০ থেকে ২৫০ মিলিলিটার (প্রায় এক গ্লাস) জুস যথেষ্ট। এর বেশি খেলে পাকস্থলীতে অস্বস্তি বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা হতে পারে।
বিটুরিয়া (Beeturia): প্রতিদিন বিটরুট খেলে আপনার প্রস্রাব বা পায়খানার রঙ গোলাপি বা লালচে হয়ে যেতে পারে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানে 'বিটুরিয়া' বলে। এটি বিটরুটের লাল রঞ্জক পদার্থের (pigment) কারণে হয় এবং সম্পূর্ণ ক্ষতিকর নয়। অনেকে এটাকে রক্তের সাথে গুলিয়ে ফেলেন। আপনি যদি নিয়মিত বিটরুট খান এবং এই রঙের পরিবর্তন দেখেন, তাহলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
বিটরুট খাওয়ার সময় সাধারণ কিছু ভুল
অনেকে স্বাস্থ্যের কথা ভেবে বিটরুট খাওয়া শুরু করেন, কিন্তু কিছু সাধারণ ভুলের কারণে এর পুরো সুবিধা পান না।
- মুখ ধোয়ার ওষুধ ব্যবহার করা: বিটরুটের নাইট্রেট নাইট্রাইটে রূপান্তরিত হওয়ার প্রথম ধাপটি ঘটে মুখের লালায়। আপনি যদি খুব শক্তিশালী অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল মাউথওয়াশ ব্যবহার করেন, তবে মুখের উপকারী ব্যাকটেরিয়া মারা যায় এবং নাইট্রেটের রূপান্তর প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
- জুসে চিনি মেশানো: বিটরুটের জুসের স্বাদ মাটির মতো হওয়ায় অনেকে তাতে চিনি বা মধু মেশান। এতে অতিরিক্ত ক্যালোরি যুক্ত হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ে।
- ওষুধের বিকল্প ভাবা: বিটরুট রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে, তবে এটি উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের বিকল্প নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শুধু বিটরুট খেয়ে ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
- শুধু জুস খাওয়া: ফাইবারের সুবিধা পেতে জুসের পাশাপাশি পুরো বিটরুট সালাদে বা তরকারিতে খাওয়া জরুরি।
যা মনে রাখবেন
প্রতিদিন বিটরুট খেলে শরীরে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, পেশিতে অক্সিজেনের প্রবাহ বৃদ্ধি এবং হজমশক্তি উন্নতির মতো ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। এর পেছনে মূল ভূমিকা রাখে প্রাকৃতিক নাইট্রেট এবং ফাইবার।
তবে আপনার শরীরের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা না করে এটি খাওয়া ঠিক হবে না। কিডনিতে পাথরের সমস্যা থাকলে বা রক্তচাপের ওষুধ খেলে প্রতিদিন বিটরুট খাওয়ার আগে অবশ্যই একজন চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সাথে কথা বলুন। পরিমিত পরিমাণে এবং সঠিক উপায়ে খেলে বিটরুট আপনার দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার একটি কার্যকর অংশ হতে পারে।