নিজেকে বদলাতে পারছি না কেন? আমার ব্যর্থতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

রাত তখন ২টা বাজে আর ঢাকার রাস্তায় সব শব্দ থেমে গেছে। আমি বিছানায় শুয়ে আছি, হাতে আমার ফোন। ফেসবুকে রিলস দেখছি, অথচ কথা ছিল আজ রাত ১১টায় ঘুমাব। কাল সকালে উঠে ইংরেজি প্র্যাকটিস করব বলে ঠিক করেছিলাম। কিন্তু আমি তা পারিনি এবং নিজের ওপর খুব রাগ হচ্ছিল।

আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম, নিজেকে বদলাতে পারছি না কেন? আমার কি আসলে ইচ্ছার অভাব আছে? নাকি আমি আসলে একটা অলস মানুষ? এসব প্রশ্ন আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল।

আমি নোমান, পেশায় একজন ফেসবুক অ্যাডস এক্সপার্ট। আমি সারাদিন মানুষের ব্যবসার সেল বাড়ানোর স্ট্র্যাটেজি সাজাই। বই রথ-এ কাজ করি এবং হাজার হাজার মানুষকে Atomic Habits-এর মতো বই পাঠাই। অথচ সেই আমিই নিজের অভ্যাস বদলাতে পারছিলাম না। এটা আমার জন্য খুব লজ্জার বিষয় ছিল।

আমি জানি এই অনুভূতি আপনারও মাঝে মাঝে হয়। আপনি হয়তো ডায়েট শুরু করতে চান, বা নতুন কোনো স্কিল শিখতে চান। দুই দিন করেন, তারপর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যান। নিজের ওপর রাগ হয়, এমনকি নিজেকে ঘৃণা করতে শুরু করেন।

আজ আমি কোনো গুরুগম্ভীর জ্ঞান দেব না। আমি আমার নিজের যুদ্ধের গল্প বলব। কেন আমরা বারবার ব্যর্থ হই এবং কীভাবে আমি এই চক্র থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করছি, সেটাই আজ শেয়ার করব। আশা করি আমার অভিজ্ঞতা আপনার কাজে লাগবে।

মস্তিষ্কের আসল খেলা: কমফোর্ট জোন

আমরা ভাবি আমাদের সমস্যা হলো আমাদের মোটিভেশন নেই। আসলে সমস্যাটা আমাদের মোটিভেশনে নয়, মস্তিষ্কের গঠনে। আমি যখন বই রথ-এর জন্য মার্কেটিং প্ল্যান করি, তখন বুঝি মানুষের মন কীভাবে কাজ করে। মানুষের মন খুব অদ্ভুত।

আমাদের মস্তিষ্ক টিকে থাকার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, উন্নতি করার জন্য নয়। সে সবসময় শক্তি বাঁচাতে চায় এবং অলস থাকতে পছন্দ করে। যখনই আপনি নতুন কিছু করতে যান, মস্তিষ্ক বিপদ সংকেত দেয়। সে আপনাকে থামিয়ে দিতে চায়।

ধরুন, আপনি ঠিক করলেন কাল থেকে জিমে যাবেন। আপনার মস্তিষ্ক বলবে, “থাক না, আজ শরীরটা ম্যাজ ম্যাজ করছে। কাল যাব।” এটা আপনার অলসতা নয়, এটা আপনার মস্তিষ্কের ‘সেফটি মেকানিজম’। সে পরিচিত আরাম বা কমফোর্ট জোন ছাড়তে চায় না।

আমি যখন প্রথম ইংরেজি শেখার জন্য সিরিয়াস হলাম, তখন বই খুললেই আমার ঘুম আসত। কারণ আমার ব্রেইন তখন প্রচুর এনার্জি খরচ করছিল নতুন ভাষা বুঝতে। তাই সে আমাকে ঘুমানোর সিগন্যাল দিত যাতে এনার্জি বাঁচে। এই বায়োলজিক্যাল বাধাটা না বুঝলে নিজেকে দোষারোপ করা ছাড়া উপায় থাকে না।

আমরা কেন বারবার ব্যর্থ হই

আমি আমার ব্যর্থতার কারণগুলো নিয়ে অনেক ভেবেছি। আমি খাতা কলম নিয়ে বসেছিলাম এবং আমার ভুলের প্যাটার্নগুলো বের করার চেষ্টা করলাম। আমি দেখলাম মূলত তিনটি বড় ভুলের কারণে আমি বারবার পিছলে পড়ি। এই ভুলগুলো আমাদের সবারই হয়।

নিচে আমার ভুল এবং বাস্তবতার একটি টেবিল দিলাম। দেখুন তো আপনার সাথে মেলে কি না:

আমার ভুল ধারণাবাস্তবতা
কাল থেকে জীবন একদম বদলে ফেলব।মস্তিষ্ক বড় পরিবর্তন ভয় পায়।
মোটিভেশন থাকলে সব করা সম্ভব।মোটিভেশন আবেগের মতো, বেশিক্ষণ থাকে না।
একদিন মিস মানে আমি ব্যর্থ।ব্যর্থতা হলো প্রক্রিয়ার একটা অংশ।
ইচ্ছাশক্তি দিয়েই সব জয় করব।পরিবেশ ইচ্ছাশক্তির চেয়ে শক্তিশালী।

এই ভুলগুলো আমি দিনের পর দিন করেছি। আমি একসাথে অনেক কিছু বদলাতে চেয়েছি। সকালে ব্যায়াম, দুপুরে রিডিং, বিকেলে স্কিল ডেভেলপমেন্ট। ফলাফল হলো শূন্য। দুই দিন পর আমি ক্লান্ত হয়ে সব ছেড়ে দিয়েছি।

ডোপামিনের ফাঁদ এবং সোশ্যাল মিডিয়া

একজন অ্যাডস এক্সপার্ট হিসেবে আমি জানি ডোপামিন কী। আমরা যখন ফেসবুকে একটা লাইক পাই বা সুন্দর কোনো ভিডিও দেখি, আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন রিলিজ হয়। এটা আমাদের সাময়িক আনন্দ দেয় এবং আমরা আসক্ত হয়ে পড়ি।

সমস্যা হলো, নিজেকে বদলানোর কাজটা বোরিং। বই পড়লে সাথে সাথে ডোপামিন পাওয়া যায় না। ব্যায়াম করলে সাথে সাথে সিক্স প্যাক হয় না। কিন্তু ফোন হাতে নিলে সাথে সাথে আনন্দ পাওয়া যায়। মস্তিষ্ক সবসময় সহজ আনন্দ খোঁজে।

আমার সমস্যা ছিল আমি কাজের ফাঁকে ৫ মিনিটের জন্য ফোন হাতে নিতাম। তারপর কখন ১ ঘণ্টা পার হয়ে যেত বুঝতেই পারতাম না। আমার মস্তিষ্ক সহজ আনন্দ বা ‘ইনস্ট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশন’ খুঁজত। এটা আমার সময়ের বারোটা বাজাত।

নিজেকে বদলাতে না পারার এটা একটা বড় কারণ। আমরা এখন ধৈর্যের ফল মিষ্টি—এটা বিশ্বাস করতে চাই না। আমরা এখনই ফল চাই। যখন দেখি দুই দিন ব্যায়াম করে ওজন কমছে না, আমরা ছেড়ে দিই। আমরা ভুলে যাই যে আসল পরিবর্তন দেখা যেতে সময় লাগে।

আমার পরিবেশ আমার শত্রু ছিল

আমি লক্ষ্য করলাম আমার কাজের টেবিলটা ভীষণ অগোছালো। সেখানে চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল, আর তারের জটলা। বইগুলো শেলফে এমনভাবে রাখা যে হাত দিলেই ধুলো লাগবে। পরিবেশটাই কাজের অনুপযুক্ত ছিল।

অন্যদিকে আমার ফোনটা সবসময় আমার হাতের কাছে থাকত। আমার পরিবেশ আমাকে অলস হতে সাহায্য করছিল। আমি চাইলেও ফোকাস করতে পারছিলাম না। পরিবেশ আমাকে বারবার বিভ্রান্ত করছিল।

আমি একদিন সময় নিয়ে আমার রুমটা পরিষ্কার করলাম। অপ্রয়োজনীয় সব জিনিস ফেলে দিলাম। যে বইটা আমি পড়তে চাই, সেটা বালিশের পাশে রাখলাম। ফোনটা রাখলাম অন্য রুমে চার্জে। পরিবেশ বদলানো খুব জরুরি।

বিশ্বাস করুন, পরিবেশ বদলানোর পর কাজ করা অনেক সহজ হয়ে গেল। যখন ফোন চোখের সামনে নেই, তখন ফেসবুকে ঢোকার ইচ্ছাটাও কমে গেল। যখন বইটা চোখের সামনে, তখন সেটা হাতে নেওয়া সহজ হলো। বাধাগুলো সরে গেল।

আপনি যদি নিজেকে বদলাতে না পারেন, তবে আপনার চারপাশটা দেখুন। আপনার পরিবেশ কি আপনাকে সাহায্য করছে, নাকি বাধা দিচ্ছে? পরিবেশ ঠিক করলে ইচ্ছাশক্তি কম খরচ হয়।

ছোট পদক্ষেপের জাদু

আমি আগে ভাবতাম, আমাকে রোজ ১ ঘণ্টা ইংরেজি প্র্যাকটিস করতে হবে। এই ১ ঘণ্টার কথা ভাবলেই আমার জ্বর আসত। তাই শুরুই করা হতো না। বড় লক্ষ্য আমাকে ভয় পাইয়ে দিত।

তারপর আমি একটা নতুন পদ্ধতি শিখলাম। ‘মাইক্রো হ্যাবিট’ বা ছোট অভ্যাস। আমি নিজেকে বললাম, “নোমান, তোমাকে ১ ঘণ্টা পড়তে হবে না। তুমি শুধু ৫ মিনিট পড়ো।” ৫ মিনিট তো চোখের পলকেই চলে যায়।

৫ মিনিট পড়া কোনো ব্যাপারই না। আমি সহজেই রাজি হলাম। মজার ব্যাপার হলো, একবার ৫ মিনিটের জন্য বসলে আমি প্রায়ই ২০-৩০ মিনিট পড়ে ফেলতাম। আসল কঠিন কাজ হলো শুরু করা। শুরুটাই সবচেয়ে বড় বাধা।

আমি জিমে যাওয়ার বদলে ঘরে ১০টা পুশ-আপ দেওয়া শুরু করলাম। মাত্র ১ মিনিটের ব্যাপার। কিন্তু এই ১ মিনিট আমাকে ধারাবাহিক হতে সাহায্য করল। এখন আমি নিয়মিত ব্যায়াম করি।

আপনি যদি নিজেকে বদলাতে চান, তবে লক্ষ্য ছোট করুন। এত ছোট করুন যেন সেটা না করাটা লজ্জার বিষয় হয়। রোজ ২ পৃষ্ঠা পড়ুন বা ১ গ্লাস পানি বেশি খান। এই ছোট জয়গুলো আপনাকে আত্মবিশ্বাস দেবে।

More Post: টাকা ম্যানেজমেন্ট শেখার সহজ উপায়: আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা

নিজেকে ক্ষমা করার অভ্যাস

বদলে যাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো অপরাধবোধ। ধরুন আমি টানা ৫ দিন রুটিন মেনে চললাম। ৬ নম্বর দিনে আমি আলসেমি করলাম। ওই দিন রাতে আমি নিজেকে খুব বকাঝকা করতাম। নিজেকে খুব ছোট মনে হতো।

আমি ভাবতাম, “আমাকে দিয়ে কিছু হবে না”। এই ভেবে পরের দিন আর চেষ্টাই করতাম না। এটা ছিল আমার সবচেয়ে বড় ভুল। একে বলে ‘অল অর নাথিং’ মেন্টালিটি। যা আমাকে ডুবিয়ে দিত।

এখন আমি নিজেকে ক্ষমা করতে শিখেছি। মানুষ রোবট নয়, আমাদের খারাপ দিন যেতেই পারে। যেদিন আমি লক্ষ্য পূরণ করতে পারি না, আমি নিজেকে বলি, “ঠিক আছে, আজ হয়নি। কিন্তু কাল আমি আবার ট্র্যাকে ফিরব।”

একটা দিন নষ্ট হওয়া মানে পুরো জার্নি শেষ হয়ে যাওয়া নয়। আমি আমার বাইক চালানো থেকে এটা শিখেছি। রাস্তায় জ্যাম থাকতেই পারে, চাকা পাংচার হতেই পারে। তাই বলে কি আমি বাইক ফেলে দিই? না, আমি ঠিক করে আবার গন্তব্যে যাই।

কেন বদলাতে চাই—সেটা পরিষ্কার করা

আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম, আমি কেন ইংরেজি শিখতে চাই? আগে উত্তর ছিল, “সবাই শিখছে তাই।” এই কারণে আমার কোনো জোরালো ইচ্ছা ছিল না। আমি ভেতর থেকে কোনো তাগিদ পেতাম না।

তারপর আমি কারণটা বদলালাম। আমি ভাবলাম, “আমি যদি ভালো ইংরেজি পারি, আমি বাইরের দেশের বড় ক্লায়েন্টদের সাথে কাজ করতে পারব। আমি আমার পরিবারকে আরও ভালো রাখতে পারব।” এই চিন্তা আমাকে শক্তি দিল।

যখন আমার ‘কেন’ (Why) শক্তিশালী হলো, তখন ‘কীভাবে’ (How) সহজ হয়ে গেল। আবেগ ছাড়া যুক্তি দিয়ে নিজেকে বদলানো কঠিন। আপনার পরিবর্তনের সাথে একটা শক্তিশালী আবেগ জুড়ে দিন। সেটা হতে পারে আপনার পরিবারের ভালো থাকা।

More Post: How to Change Yourself: My Real Story of Starting Small

শেষ কথা: শুরুটা আজই হোক

নিজেকে বদলাতে পারছেন না বলে হতাশ হবেন না। আপনি চেষ্টা করছেন, এটাই সবচেয়ে বড় কথা। হাজার হাজার মানুষ চেষ্টাটাও করে না। আপনি তাদের চেয়ে এগিয়ে আছেন।

আমার জার্নি এখনো শেষ হয়নি। আমি এখনো মাঝে মাঝে ভুল করি। রিলস দেখতে দেখতে সময় নষ্ট করি। কিন্তু আমি এখন জানি কীভাবে ফিরে আসতে হয়। আমি আর হাল ছেড়ে দিই না।

আপনি যদি আজ এই লেখাটা পড়ে থাকেন, তবে একটা ছোট্ট কাজ করুন। আজ রাতে ঘুমানোর আগে ফোনটা দূরে রাখুন। মাত্র ২ মিনিটের জন্য চোখ বন্ধ করে ভাবুন আপনি কেমন মানুষ হতে চান।

কাল সকালে উঠে বিশ্ব জয় করার দরকার নেই। শুধু বিছানাটা গোছান বা এক গ্লাস পানি খান। ব্যস, এটুকুই। এই ছোট ছোট জয়গুলোই একদিন আপনাকে বদলে দেবে।

নিজেকে বদলানো কোনো ১০০ মিটারের দৌড় নয়। এটা একটা ম্যারাথন। আস্তে দৌড়ান, কিন্তু থামবেন না। আমি আপনার ওপর বিশ্বাস রাখি। আপনিও নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন। পরিবর্তন আসবেই।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)

নিজেকে বদলানোর জন্য সেরা টুল কোনটি?

মাইক্রো হ্যাবিট বা ছোট অভ্যাস হলো সেরা টুল। বড় লক্ষ্য না নিয়ে রোজ মাত্র ২-৫ মিনিটের জন্য কাজ শুরু করুন। এতে মস্তিষ্কের ভয় কমে এবং কাজ করা সহজ হয়।

পরিবেশ বদলানো বা ‘এনভায়রনমেন্ট ডিজাইন’ কেন জরুরি?

পরিবেশ আপনার ইচ্ছাশক্তির চেয়েও শক্তিশালী টুল। পড়ার টেবিলে ফোন না রেখে বই রাখলে পড়া সহজ হয়। ভালো পরিবেশ আপনাকে অটোমেটিক কাজ করতে সাহায্য করে।

একদিন রুটিন মিস হলে কী করা উচিত?

নিজেকে দোষ না দিয়ে ক্ষমা করুন, কারণ আমরা রোবট নই। একদিনের ব্যর্থতা মানেই সব শেষ নয়। পরের দিনই আবার ট্র্যাকে ফিরে আসুন, এটাই আসল চাবিকাঠি।

মোটিভেশন ধরে রাখার কার্যকরী উপায় কী?

মোটিভেশন একটি আবেগের মতো, যা বেশিক্ষণ টিকে থাকে না। তাই সিস্টেম বা রুটিন-এর ওপর নির্ভর করুন। কাজ শুরু করলেই মোটিভেশন এমনিতেই চলে আসবে।

সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি কমানোর সহজ উপায় কী?

কাজের সময় ফোনটি চোখের আড়ালে বা অন্য রুমে রাখুন। ডোপামিনের ফাঁদ থেকে বাঁচতে এই ছোট্ট ফিজিক্যাল ব্যারিয়ার বা বাধাটি ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

:

2 thoughts on “নিজেকে বদলাতে পারছি না কেন? আমার ব্যর্থতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প”

Leave a Comment