Beetroot Juice পান করলে শরীরে কী পরিবর্তন আসে

Beetroot Juice বা বীটরুটের রস নিয়মিত পান করলে শরীরে নাইট্রিক অক্সাইডের মাত্রা বাড়ে, যা রক্তনালিগুলোকে প্রসারিত করে। এর ফলে রক্তচাপ কিছুটা কমতে পারে এবং পেশিতে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ উন্নত হয়। ব্যায়ামের আগে এটি পান করলে শারীরিক সহনশীলতা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।

এই পরিবর্তনগুলোর পেছনে বীটরুটে থাকা ডায়েটারি নাইট্রেট প্রধান ভূমিকা রাখে। তবে এই রস সবার জন্য একইভাবে কাজ করে না। কিডনিতে পাথরের সমস্যা বা নির্দিষ্ট ওষুধ সেবনকারীদের ক্ষেত্রে এটি ঝুঁকির কারণ হতে পারে। নিচে শরীরে এর সুনির্দিষ্ট প্রভাব, কার্যপদ্ধতি ও সতর্কতার বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

বীটরুট জুসে কী কী পুষ্টি উপাদান থাকে

বীটরুটের রসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ডায়েটারি নাইট্রেট। এ ছাড়া এতে ফোলেট, পটাশিয়াম, আয়রন, ভিটামিন সি এবং ম্যাঙ্গানিজ থাকে। বীটরুটের লালচে-বেগুনি রঙের জন্য দায়ী বেটালাইন নামক একটি যৌগ, যা সাধারণ খাদ্যতালিকায় খুব একটা পাওয়া যায় না।

এক গ্লাস বীটরুটের রসে চিনির পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকে, কারণ গোটা বীটরুটের চেয়ে রসে আঁশ বা ফাইবার অনেকটাই বাদ পড়ে যায়। আঁশ ছাঁকা হয়ে যাওয়ার কারণে শরীর এখানকার পুষ্টি উপাদানগুলো বেশ দ্রুত গ্রহণ করতে পারে।

নাইট্রেট কীভাবে রক্তনালিকে প্রভাবিত করে

বীটরুটের রস পান করার পর মুখের লালাগ্রন্থির ব্যাকটেরিয়া নাইট্রেটকে নাইট্রাইটে রূপান্তরিত করে। এরপর সেই নাইট্রাইট পাকস্থলীতে গিয়ে নাইট্রিক অক্সাইডে পরিণত হয়। নাইট্রিক অক্সাইড হলো এমন একটি গ্যাসীয় অণু, যা রক্তনালির দেয়ালের পেশিগুলোকে শিথিল করে।

রক্তনালি শিথিল হলে তা প্রশস্ত হয় এবং রক্ত চলাচলের পথ সহজ হয়। এই প্রক্রিয়াটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে, বিশেষ করে পেশিতে অক্সিজেন পৌঁছাতে সাহায্য করে। ব্যায়ামের সময় পেশিতে যখন অক্সিজেনের চাহিদা বাড়ে, তখন নাইট্রিক অক্সাইডের এই বাড়তি সরবরাহ কাজে আসে।

রক্তচাপ ও হৃৎপিণ্ডের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

রক্তনালি প্রসারিত হওয়ার সরাসরি ফলাফল হলো রক্তচাপের ওপর প্রভাব। নাইট্রিক অক্সাইড রক্তনালির প্রতিরোধ কমিয়ে দেয়, ফলে হৃৎপিণ্ডকে রক্ত পাম্প করতে কম চাপ দিতে হয়। স্বাভাবিক বা সামান্য উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে এমন মানুষদের ক্ষেত্রে বীটরুটের রস পানের পর রক্তচাপ কিছুটা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়।

তবে এই প্রভাব স্থায়ী কোনো চিকিৎসা নয়। রস পানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নাইট্রিক অক্সাইডের মাত্রা সর্বোচ্চ থাকে এবং ধীরে ধীরে তা কমে যায়। যারা ইতোমধ্যে রক্তচাপ কমানোর ওষুধ খাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে বীটরুটের রস পান করলে রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ওষুধ সেবনকারীদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত এটি পান করা উচিত নয়।

শারীরিক কর্মক্ষমতা ও ব্যায়ামে এর ভূমিকা

দৌড়, সাইকেল চালানো বা ভারোত্তোলনের মতো শারীরিক পরিশ্রমের আগে বীটরুটের রস পান করলে কর্মক্ষমতা বাড়তে পারে। নাইট্রিক অক্সাইড পেশিতে অক্সিজেন ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ায়। ফলে একই পরিমাণ কাজ করতে শরীরের কম অক্সিজেন খরচ হয় এবং ক্লান্তি আসতে দেরি হয়।

ব্যায়ামের ২ থেকে ৩ ঘণ্টা আগে বীটরুটের রস পান করলে শরীরে নাইট্রিক অক্সাইডের মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এটি বিশেষ করে মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার সহনশীলতা-নির্ভর ব্যায়ামে বেশি কার্যকর। খুব সংক্ষিপ্ত বা বিস্ফোরক ব্যায়ামে (যেমন ১০ সেকেন্ডের স্প্রিন্ট) এর প্রভাব তুলনামূলক কম দেখা যায়।

একটি বাস্তব উদাহরণ

ধরে নিন আপনি সকালে ৩০ মিনিট দৌড়ানোর অভ্যাস করেন। দৌড়ানোর ২.৫ ঘণ্টা আগে যদি প্রায় ২০০-২৫০ মিলিলিটার বীটরুটের রস পান করেন, তবে আপনার পেশিতে অক্সিজেনের সরবরাহ কিছুটা উন্নত হতে পারে। এর ফলে আগের চেয়ে একই গতিতে দৌড়াতে কম হাঁপানি লাগতে পারে বা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কয়েক মিনিট বেশি দৌড়াতে পারবেন। তবে এই পরিবর্তন সবার ক্ষেত্রে একরকম হয় না। নিয়মিত কঠোর অনুশীলনকারী পেশাদার ক্রীড়াবিদদের ক্ষেত্রে এই সুবিধা সাধারণ মানুষের তুলনায় কম লক্ষণীয় হতে পারে।

কাদের বীটরুট জুস কম পান করা উচিত

বীটরুটের রস পুষ্টিকর হলেও নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক অবস্থায় এটি ক্ষতির কারণ হতে পারে।

  • কিডনিতে পাথরের সমস্যা: বীটরুটে অক্সালেটের পরিমাণ বেশি থাকে। অক্সালেট ক্যালসিয়ামের সাথে যুক্ত হয়ে কিডনিতে পাথর তৈরি করতে পারে। যাদের ক্যালসিয়াম অক্সালেট কিডনি স্টোনের ইতিহাস আছে, তাদের বীটরুটের রস এড়িয়ে চলা বা খুব অল্প পরিমাণে পান করা উচিত।
  • রক্তচাপের ওষুধ সেবনকারী: আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, রক্তচাপ কমানোর ওষুধের সাথে বীটরুটের রসের নাইট্রেট মিলে রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমিয়ে দিতে পারে।
  • ডায়াবেটিস রোগী: গোটা বীটরুটে আঁশ থাকলেও রসে তা ছাঁকা হয়ে যায়। ফলে রসের চিনি রক্তে তুলনামূলক দ্রুত শোষিত হতে পারে। ডায়াবেটিস থাকলে রস পানের আগে রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
  • গ্যাস্ট্রিক বা এসিডিটির সমস্যা: কারো কারো ক্ষেত্রে খালি পেটে বীটরুটের রস পান করলে পাকস্থলীতে অস্বস্তি বা বমি বমি ভাব হতে পারে।

কখন এটি কাজ করে না

বীটরুটের রস পান করলেই যে সবসময় রক্তচাপ কমবে বা ব্যায়ামের ফলাফল বদলে যাবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। মুখের ভেতরের নির্দিষ্ট কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া নাইট্রেটকে নাইট্রাইটে রূপান্তরের প্রথম ধাপটি সম্পন্ন করে। আপনি যদি অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল মাউথওয়াশ নিয়মিত ব্যবহার করেন, তবে মুখের এই ব্যাকটেরিয়া মারা যায় এবং নাইট্রিক অক্সাইড তৈরির প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে বীটরুটের রস পান করেও আপনি কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাবেন না। এ ছাড়া, যারা ইতোমধ্যে অত্যন্ত উচ্চমাত্রার শারীরিক ফিটনেস অর্জন করেছেন, তাদের শরীরে নাইট্রিক অক্সাইডের প্রভাব তুলনামূলক কম দৃশ্যমান হয়।

ঘরে বীটরুট জুস তৈরি ও পানের নিয়ম

বাজারে প্রক্রিয়াজাত বীটরুটের রস পাওয়া গেলেও ঘরে তাজা রস তৈরি করা সবচেয়ে ভালো, কারণ এতে বাড়তি চিনি বা প্রিজারভেটিভ থাকে না।

১. একটি মাঝারি আকারের টাটকা বীটরুট ভালো করে ধুয়ে নিন। খোসা তোলার প্রয়োজন নেই, তবে মাটি বা দাগ থাকলে তা পরিষ্কার করুন। ২. বীটরুটটি ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নিন। ৩. জুসার মেশিনে টুকরোগুলো দিয়ে রস বের করুন। ব্লেন্ডারে করতে হলে সামান্য পানি মিশিয়ে পেস্ট করুন, এরপর পাতলা সুতির কাপড় বা ছাঁকনি দিয়ে রস ছেঁকে নিন। ৪. স্বাদ বাড়াতে এবং ভিটামিন সি যুক্ত করতে এতে সামান্য লেবুর রস বা আদার রস মেশাতে পারেন। আপেল বা গাজরের সাথে মিশিয়েও পান করা যায়।

পরিমাণের ক্ষেত্রে দিনে ২০০ থেকে ২৫০ মিলিলিটার (প্রায় এক গ্লাস) পান করা সাধারণত নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়। এর বেশি পান করলে পেটে অস্বস্তি হতে পারে।

প্রস্রাবের রঙ বদলে যাওয়া নিয়ে বিভ্রান্তি

বীটরুটের রস পান করার পর অনেকেই প্রস্রাবের বা মলের রঙ লালচে বা গোলাপি দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ঘটনাকে ‘বিটুরিয়া’ (Beeturia) বলা হয়। বীটরুটে থাকা বেটালাইন রঞ্জক পদার্থটি শরীরে পুরোপুরি ভাঙে না, তাই এটি প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে আসে।

এটি রক্তের সাথে সম্পর্কিত কোনো সমস্যা নয় এবং সম্পূর্ণ নিরীহ একটি বিষয়। সাধারণত রস পানের ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই রঙ স্বাভাবিক হয়ে যায়। আয়রনের ঘাটতি রয়েছে এমন কিছু মানুষের ক্ষেত্রে বিটুরিয়া একটু বেশি স্পষ্টভাবে দেখা যেতে পারে, তবে এটি কোনো রোগের লক্ষণ নয়।

দ্রুত তুলনা: গোটা বীটরুট বনাম বীটরুটের রস

বৈশিষ্ট্য গোটা বীটরুট বীটরুটের রস
আঁশ (ফাইবার) বেশি থাকে ছাঁকনিতে বাদ পড়ে যায়
নাইট্রেট শোষণের গতি তুলনামূলক ধীর দ্রুত শোষিত হয়
ক্যালোরি ও চিনি আঁশের কারণে ধীরে হজম হয় দ্রুত রক্তে মিশতে পারে
ব্যবহারের উদ্দেশ্য দৈনন্দিন সালাদ বা তরকারি নির্দিষ্ট সময়ে (যেমন ব্যায়ামের আগে) পান

আপনার যদি শুধু পুষ্টি ও আঁশের প্রয়োজন হয়, তবে গোটা বীটরুট সিদ্ধ করে বা কাঁচা সালাদ হিসেবে খাওয়া ভালো। আর যদি দ্রুত নাইট্রেটের সুবিধা নিতে চান, তবে রস বেশি কার্যকর।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

প্রতিদিন beetroot juice পান করা কি নিরাপদ?

সুস্থ মানুষদের জন্য প্রতিদিন ২০০-২৫০ মিলিলিটার বীটরুটের রস পান করা সাধারণত নিরাপদ। তবে কিডনিতে পাথরের সমস্যা থাকলে প্রতিদিন পান করা উচিত নয়, কারণ এতে অক্সালেট জমতে পারে। কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

বীটরুটের রস পান করলে কি ওজন কমে?

বীটরুটের রস সরাসরি চর্বি পোড়ায় না বা ওজন কমানোর কোনো জাদুকরী উপাদান নয়। তবে এটি কম ক্যালোরির একটি পুষ্টিকর পানীয়, যা মিষ্টি জাতীয় পানীয়ের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করলে সামগ্রিক ক্যালোরি গ্রহণ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

ব্যায়ামের ঠিক কতক্ষণ আগে বীটরুটের রস খাওয়া উচিত?

ব্যায়াম শুরু করার ২ থেকে ৩ ঘণ্টা আগে বীটরুটের রস পান করা সবচেয়ে কার্যকর। এই সময়ের মধ্যে শরীর নাইট্রেটকে নাইট্রিক অক্সাইডে রূপান্তরিত করে রক্তে এর মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যায়।

রক্তচাপের ওষুধ খেলে কি বীটরুটের রস পান করা যাবে?

রক্তচাপ কমানোর ওষুধ সেবনকারীদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বীটরুটের রস পান করা উচিত নয়। ওষুধ এবং বীটরুটের নাইট্রেট একসাথে কাজ করলে রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে গিয়ে মাথা ঘোরা বা দুর্বলতার সৃষ্টি হতে পারে।

বীটরুটের রস কি রক্তশূন্যতা দূর করে?

বীটরুটে আয়রন ও ফোলেট থাকে, যা লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। তবে শুধু বীটরুটের রস পান করে তীব্র রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া সারানো সম্ভব নয়। রক্তশূন্যতা থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশনায় সঠিক চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

শেষ কথা

Beetroot Juice পান করলে শরীরে কী পরিবর্তন আসে, তা মূলত নির্ভর করে আপনার বর্তমান শারীরিক অবস্থা ও খাদ্যাভ্যাসের ওপর। নাইট্রিক অক্সাইড তৈরির মাধ্যমে এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যায়ামের সহনশীলতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এটি কোনো ওষুধের বিকল্প নয়। নির্দিষ্ট পরিমাণ মেনে এবং নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতা বুঝে এটি খাদ্যতালিকায় যুক্ত করলেই এর সঠিক সুফল পাওয়া সম্ভব।

Leave a Comment